শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৮:১১ অপরাহ্ন

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের আপোষহীন ধারার বলিষ্ঠ প্রতিনিধি বিপ্লবী বাঘা যতীন

রিয়া দাস ( রাই ), রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিহাস স্নাতকোত্তরের ছাত্রী।।
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২০
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের আপোষহীন
ছবি: সংগৃহীত

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের আপোষহীন ধারার বলিষ্ঠ প্রতিনিধি বিপ্লবী বাঘা যতীন:

রিয়া দাস ( রাই ), রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিহাস স্নাতকোত্তরের ছাত্রী।।

“ মুক্তির – মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে “.

ইতিহাস আজীবন কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, আবার তাড়িত করে। সে সমস্ত ঘটনাই ইতিহাসে স্থান পায়, যা কিছু ভালো, যা কিছু প্রথম, যা কিছু মানব সভ্যতার অভিশাপ- আশীর্বাদ।

বিদূষক মিলনস্থল আজ স্মরণ করছে এমন একজন মানুষকে যে আমাদের দেশে “স্বাধীনতার হাঁসি “ আনার জন্য প্রান দিয়েছেন।
ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ১২৮৬ সালের ২১ অগ্ৰহায়নে (১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর) বাঘা যতীন জন্মগ্রহণ করেন, তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার কয়া গ্রামের মাতুলালয়ে। বাবা উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। মা শরৎশশী দেবী। স্বামীর ‘স্বর্গারোহণ’, ‘শ্মশান’, ‘সংসার’ প্রভৃতি কাব্যগ্ৰন্থের রচয়িতা ছিলেন তিনি।

তাঁদের আদি নিবাস ছিল যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার রিশখালী গ্রামে। পাঁচ বছর বয়সে তাঁর পিতার মৃত্যু হয়।এরপর মা এবং বড় বোন বিনোদ বালার সাথে তিনি মাতামহের বাড়ি কয়া গ্রামে চলে আসেন। শৈশব থেকেই যতীন শারীরিক দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল । স্বভাব কবি মায়ের আদর স্নেহে মাতুলালয়ে ই বড় হয়ে উঠেছিলেন। শৈশব-কৈশোর তাঁর সবকিছু এখানেই কেটেছে।

বাঘা যতীন দেশের জন্য নিজের মূল্যবান জীবন, ও সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আত্মাহুতি দিয়ে যে অবিশ্বাস্য দেশপ্রেম দেখিয়ে গেছেন তার কোনো তুলনা হয় না।
বাঘা যতীনের জীবনের সমস্ত ঘটনা জানতে পারবেন যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় এর বই “ বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি “থেকে।
১৯১৩ সালে বর্ধমান ও কাঁথির ভয়াবহ বন্যায় ত্রাণকার্যের সময় ও তাঁকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যায়। সেই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সেই সময়কার কথা জানা যায় ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা থেকে, ‘ যতীন দা বসেছেন উদার আকাশের নীচে দৌলতপুর কলেজ হোস্টেলের দোতলার খোলা বারান্দায়। গভীর রাত। আমি একলা ওঁর দিকে চেয়ে বসে। যতীন দার ওই মুখ খানা, ওই চোখ দুটো, ওই বুক খানার সঙ্গে ওই আকাশ খানার কোথায় যেন যোগ আছে, কোথায় মিল আছে। ‘

বিংশ শতাব্দীর শুরুর সময়টা কুষ্টিয়ার কয়া গ্রামের মানুষ হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে উঠল। জানা যায়,পাশের জঙ্গলে নাকি একটা বিশাল বাঘ দেখা গেছে। বাঘটির ভয়ে দিনের বেলাতেও কেউ রাস্তা ঘাটে সেরকম বের হয় না। আর রাতে তো কোনো কথাই হবে না। কয়া গ্রামে মূলত একজনের কাছেই বন্দুক ,আর তিনি হলেন ফণিভূষণ বাবু। ঠিক কিছু দিন আগেই কৃষ্ণনগর থেকে মামাবাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন তরুণ যতীন্দ্রনাথ। শুধুমাত্র সে একটি ছোরা নিয়ে একাই বাঘটিকে হত্যা করতে সক্ষম হন।আর তারপর থেকেই তার নাম রটে যায় বাঘা যতীন। হয়তো সকলেই সেটা জানেন।

বিখ্যাত বিপ্লবী এম এন রায় মন্তব্য করেছিলেন, আমি বাঘা যতীন ও লেনিন দুজনকেই দেখেছি। এ দুজনের মধ্যে বাঘা যতীন ই শ্রেষ্ঠ। বিপ্লবী এম এন রায় তার এই মন্তব্যের মাধ্যমে মহামতি লেনিনকে ছোট করেন নি। বরং বাঘা যতীন যে একজন বিশাল মাপের মানুষ সেটি তার এই মন্তব্যের মাধ্যমে সকলকে বোঝাতে চেয়েছেন।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর চমৎকার দেশপ্রেম মূলক ‘ নব ভারতের হলদিঘাট ‘ কবিতায় বাঘা যতীন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের কীর্তি ও বীরত্ব গাথা রচনা করেছেন। ১৯৩০ এ প্রকাশিত তাঁর ‘ প্রলয় শিখা ‘ কাব্যে কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত।
“ বাঙ্গালির রণ দেখে যা তোরা রাজপুত, শিখ, মারাঠা জাঠ, বালাশোর – বুড়ি বালামের তীর নব ভারতের হলদিঘাট। “

মোগল সম্রাট প্রবল পরাক্রান্ত আকবরের সেনাপতি মান সিংহের বিশাল বাহিনীর সাথে মেবারের রানা প্রতাপ যেমন তাঁর রাজ্যের স্বাধীনতা রক্ষায় ১৫৭৬ সালের ১৮ জুন হলদিঘাটের অসম যুদ্ধে দুর্দান্ত পরাক্রম প্রদর্শন করেছিলেন, ঠিক তেমনি উড়িষ্যার বালেশ্বরের বুড়ি বালামের তীরে বাঘা যতীনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের চার ভূমিপুত্র বঙ্গসন্তান ৯ সেপ্টেম্বর ১৯১৫ সালে বিশাল পুলিশ বাহিনীর সাথে বনে মহাপরাক্রম প্রদর্শন করে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অমর ইতিহাস হয়ে আছেন।

যতীনের আত্মদান যে বৃথা যায় নি বলেছিলেন – আমরা মরব, দেশ জাগবে। তাঁর আত্মবলিদানের পর রাজনৈতিক দিয়ে যে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়, ভারতবাসীর মননে তার ক্ষেত্র তিনি ও বিপ্লবীরা প্রস্তুত করেছিলেন।
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাশ্ববর্তী শিলাইদহে তার জমিদারি সংক্রান্ত নানা প্রয়োজনে যতীনের বড় মামা বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায়( বিপ্লবী হরিপদ চট্টোপাধ্যায়ের পিতা) যেহেতু তিনি একজন কৃষ্ণনগরের আইনজীবী এবং আইনের অধ্যাপক তাই তার পরামর্শ নিতেন। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ইতিহাস ভক্ত। গীতাঞ্জলি র একটি কবিতা ‘ ধূলামন্দির ‘ কয়া গ্রামে বসে লিখেছিলেন কবি।

বিপ্লবী বাঘা যতীন যে নজরুল মানসে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন, তাঁর সৃষ্টি কর্ম ই সে প্রমাণ বহন করে। বাঘা যতীন ছিলেন বাংলার প্রধান বিপ্লবী সংগঠন, আর তাঁর সাথে সাথে যুগান্তর দলের প্রধান নেতাও । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে কলকাতার জার্মান যুবরাজের সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে সাক্ষাৎ করে জার্মানি অস্ত্র ও রসদের প্রতিশ্রুতি অর্জন করেছিলেন।
যতীন ছিলেন শক্ত সমর্থ ও নির্ভীক চিত্তধারী এক যুবক। অচিরেই তিনি একজন সৎ, অনুগত, অন্তরিক এবং পরিশ্রমী কর্মচারী হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। ৭০০ টাকা চাকরি ১৯০২ সালে কলকাতা আসেন আরেক বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ। তৎকালীন ৭০০ টাকা মানে বর্তমান লক্ষ টাকারও বেশী তাই তো। যে লক্ষ টাকার চাকুরি ছেড়ে দেশের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে পারে তার উপর ভরসা করাই যায় নিশ্চিন্তে। যতীন অবশ্য ভুল করেন নি। ভরসা করেছিলেন অরবিন্দ ঘোষের উপর।তাঁর সাথে থেকে শিখেছেন বিপ্লবী কর্মকান্ড চালানোর কৌশল ও। বিপ্লবী দলের লোকজন মিলে এক বছরের মধ্যেই কলকাতার ১০২ নং আপার সার্কুলার রোডে গড়ে তোলেন বিপ্লবী আখড়া। প্রায় পাঁচ বছর নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চলতে থাকে এই বিপ্লবী কর্মকান্ড।কিন্তু ১৯০৮ সালে হঠাৎ যতীনদের বোমা তৈরির কারখানা জব্দ করে পুলিশ। জানতে পেরে যায় যে, এই বিপ্লবী দলে রয়েছে সরকারের ব্যক্তিগত একজন সচিব। আর যেহেতু কর্মসূত্রে সেই সময় যতীনই ছিলেন বাংলার গভর্নরের ব্যাক্তিগত নির্বাহী।

জার্মান থেকে আসা ম্যাভেরিক জাহাজ ভর্তি অস্ত্রের ব্যাপারটি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বাঘা যতীনরা তখন আর অস্ত্র খালাস করতে পারেন নি। খালাসের আগেই অপরিকল্পিত এক সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয় বাঘা যতীন দের। সে যুদ্ধে গুলি বিদ্ধ হয়ে বাঘা যতীন একদিন( ৯ সেপ্টেম্বর গুলি বিদ্ধ হন, মৃত্যু বরণ করেন ১০ সেপ্টেম্বর ১৯১৭) পরেই মৃত্যু বরণ করেন।

বাঘা যতীনের মৃত্যুর আগ- মূহুর্তে পর্যন্ত চার্লস টেগার্ট তাঁকে বিচলিত কন্ঠে বলেছিল, Tell me Mukherjee, what can I do for you ? বাঘা যতীনের মৃত্যুর পর চালর্স টেগার্ট মাথার ক্যাপ খুলে তাঁকে স্যালুট করে বলেছিলেন, I have high regard for him. I have met the bravest Indian, but I had to perform my duty. বাঘা যতীনের বিপ্লব পন্থা ও মৃত্যু এ উপন্যাসে নানা ভাবে পরিগৃহীত হয়েছে তা অনুমান করা যেতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ বাঘা যতীনের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বলেছিলেন যে, পরাধীন ভারতে তাঁর এ মৃত্যু সামান্য নয়।তারপর মহাত্মা গান্ধী ও মন্তব্য করেছিলেন যে, বাঘা যতীন স্বগীয় ব্যক্তিত্ব (Divine personality) । মানবেন্দ্রনাথ রায় ( এম এন রায়) যিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনিও বলেছিলেন যে, বাঘা যতীন মানব জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ দের অন্যতম ও আর তিনি শুধু যতীনদাকেই অন্ধভাবে অনুসরণ করতেন। এম এন রায় বলেন যে অন্য দাদারা চৌম্বকত্ব অনুশীলন করতেন,আর যতীন চৌম্বকত্ব ধারণ করতেন।

বিপ্লবী বাঘা যতীনের ৩৬ বছরের ছোট্ট জীবনে তিনি তাঁর জীবন সংগ্রাম দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখে গেছেন। তিনি মানুষের স্বাধীনতা, অধিকার ও শোষণ মুক্তির আন্দোলন সংগ্রামে চির ভাস্বর হয়ে বেঁচে রইলেন মানুষের মাঝে। বাঙালি জাতির গর্ব ‘ বাঘা যতীন ‘ বেঁচে থাকবেন যুগ- যুগান্তর ধরে বাঙালির চেতনার কর্মে ও বিপ্লবে।

ছবি ও তথ্যসূত্র :
১/ স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবীদের ভূমিকা : সুধাংশু দাশগুপ্ত, ন্যাশনাল বুকস এজেন্সি কলকাতা, প্রকাশ কাল ২০০৯ সাল।
২/ বাঘা যতীন : পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। দেজ পাবলিকেশন। প্রকাশ কাল ২০০৩ নভেম্বর।
৩/ আনন্দবাজার পত্রিকা।

পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

One thought on "ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের আপোষহীন ধারার বলিষ্ঠ প্রতিনিধি বিপ্লবী বাঘা যতীন"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এইরকম আরো খবর দেখুন

© All rights reserved © 2020- SottoSamachar.Com || মানুষের সাথে, মানুষের পাশে।

Search Results

Web result with site link

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesba-lates1749691102